বেঁচে ফেরা সন্তানকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন মা

নারায়ণগঞ্জ বার্তা ২৪ ( নিজস্ব প্রতিবেদক ) : নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা সন্তান আদনানকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন মা। ২০শে মার্চ রবিবার বিকালে এমনিই একটি দৃশ্য দেখা যায়।

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় ডুবে যাওয়া মুন্সিগঞ্জগামী লঞ্চে ছিলেন মুন্সিগঞ্জের পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাঁও এলাকার আদনান দেওয়ান আদর (১৮)। সে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জে ফিরছিলো সে।

লঞ্চটি দূর্ঘটনার পরপর নদীতে ঝাপ দেন আদনান। নদীতে ভেসে থাকা পানির বোতল আঁকড়ে ধরে প্রাণপণ চেষ্টায় নি:শ্বাস স্বাভাবিক রাখেন আদনান। এরপর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ট্রলারে তোলেন।

এদিকে, মায়ের কোল থেকে ১০ মিটার দূরত্বে অন্য একটি ট্রলারে আদনান। আদনানের মায়ের চোখ-মুখে ততক্ষণে উচ্ছাস। যা কিছুক্ষণ আগেও ছিলো শঙ্কা আর চাপা কান্নায় মাখা। পরম আদরের ধনকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন মা। হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়-কপালে। ভেবেছিলেন ছেলেকে হয়তো জীবিত পাবেন না। কিন্তু ছেলেকে পেলেন পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায়। যেন মায়ের চোখে দ্বিতীয় জীবন ফিরে পাওয়ার আনন্দ দেখতে পেলেন ছেলে। সেই দৃশ্যটি দেখা রবিবার দেখা যায়।

বেঁচে ফেরা আদনান বলেন, এটা অন্যরকম অনুভুতি। লঞ্চটি যখন ডুবে যাচ্ছিলো তখন সবাই আর্তনাদ করছিলো। আমি দ্বিকবিদিক না চেয়ে নদীতে লাফ দেই। লাফ দেয়ার সময় বারবার মায়ের চেহারা চোখে ভাসছিলো। নদীতে ভেসে থাকা পানির বোতল আঁকড়ে ধরে কোনরকমে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকি। এরপর স্থানীয়রা আমাকে নদী থেকে উদ্ধার করে ট্রলারে তোলেন। যখন পানি থেকে আমাকে উদ্ধার করা হয় আমি তখনও বারবার মায়ের কথাই ভাবছিলাম। এর কিছুক্ষণ পরই দেখি মা ট্রলার নিয়ে আমাকে খুঁজতেছে। মা’কে দুর থেকে যখন দেখলাম তখন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হলো। মনে হচ্ছিলো, মায়ের দোয়া আমার সাথে ছিলো। সেকারণেই আমি বোধহয় বেঁচে গেছি।

এরআগে লঞ্চ ডুবির ঘটনা শুনে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ছেলের খোঁজে ট্রলার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট অংশে পৌঁছান মা। সেখানেই দেখা হয় মা ও ছেলের। পরে তারা বাড়িতে ফিরে যান।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর লঞ্চকে ধাক্কা দেওয়া জাহাজটিকে আটক করেছে নৌপুলিশ। দুপুরে চর সৈয়দপুরের আল আমিননগর এলাকায় দুর্ঘটনার পরই জাহাজটি মুন্সিগঞ্জের হোসেন দ্য ডকইয়ার্ডে নোঙর করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে কার্গোটি আটক করে।

এরআগে রবিবার দুপুর আড়াইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার আল আমিননগর ও সৈয়দপুরের মাঝামাঝি কয়লাঘাট এলাকায় নির্মিতব্য নাসিম ওসমান ব্রিজের কাছে কার্গো জাহাজ এমভি রূপসী ৯ এর ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এম এল আফসার উদ্দিন ডুবে যায়। লঞ্চে ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিল। উদ্ধার অভিযানে এখন পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একজন হাসপাতালে মারা গেছেন। বাকিদের মধ্যে দুইজন নারী, একজন পুরুষ ও দুই শিশু। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও নৌ মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম বলেন, মুন্সিগঞ্জের হোসেনদী ডকইয়ার্ড থেকে জাহাজটি আটক করা হয়েছে। জাহাজের মাস্টার ও ড্রাইভার পালিয়ে গেছে। তবে অন্য স্টাফদের আটক করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ জানান, লঞ্চ ডুবির ঘটনায় প্রতিটি মরদেহের সাথে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। উদ্ধার কাজ শেষ হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

add-content

আরও খবর

পঠিত