গণপিটুনি নয়, মিলনের পরিবারের দাবি হত্যা

নারায়ণগঞ্জ বার্তা ২৪ : আমার পোলাডারে মাইরা শরীলো কিচ্ছু রাখে নাই। হাত-পায়ের রগটি কাইট্টা ফেলছে। আমার পোলা খারাপ মানলাম, তাই বইলা তারে মাইরা ফেলবো? এইটা কি আইনে আছে?’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সহিতুন নেছা। তাঁর ছোট ছেলে মো. মিলন গত ২২ জানুয়ারি দুপুরে নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। তাঁর দুই হাত ও পা ভাঙা এবং সারা শরীরে ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত।

স্থানীয় এলাকাবাসীর অধিকাংশের দাবি, তাদের গণপিটুনিতে ‘সন্ত্রাসী’ মিলনের মৃত্যু হয়েছে। তবে, নিহতের পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পরিবারের সাথে পুরোনো দ্বন্দ্বের জেরে তাকে হত্যা করে ‘গণপিটুনির’ নাটক সাজানো হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আটিগ্রাম এলাকায় স্ত্রী ও এক বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে ভাড়াবাসায় থাকতেন মো. মিলন। ৩৬ বছর বয়সী এই যুবকের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ সাতটি মামলা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাইসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে যুক্ততার অভিযোগ স্থানীয় এলাকাবাসীরও।

ঘটনার পর গণপিটুনিতে মিলনের মৃত্যুর ব্যাপারটি সামনে আসলেও প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে গত দুইদিনের অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত মিলনের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান ও তাঁর পরিবারের লোকজনের দ্বন্দ্ব ছিল। বছরখানেক আগে মিলন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে থানায় মামলাও করেছিলেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন মিলন।

স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত শাহজাহান এলাকায় ‘দুবাই শাহজাহান’ বলে অধিক পরিচিত। গত ২২ জানুয়ারি মিলনকে হত্যার ঘটনা শাহজাহানের বাড়ির সামনেই ঘটেছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অন্তত দুইজন পুরুষ ও একজন নারী বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে দুপুর দেড়টার কিছুক্ষণ পর। ওই দুপুরে একটি মোটরসাইকেলে এলাকায় ঢোকেন মিলন। ওই মোটরসাইকেলে আরও দুইজন ছিলেন। শাহজাহানের বাড়ির সামনে তাঁর ও তাঁর ভাইদের সাথে তর্কবিতর্ক হয় মিলন ও তার সাথে থাকা লোকজনের। এক পর্যায়ে শাহজাহান ও তাঁর ভাইরা মিলে মিলন ও তাঁর সহযোগীদের মারধর করে। দুইজন পালিয়ে যেতে পারলেও মিলনকে তারা আটকে ফেলে। তখন ঘটনাস্থলে শাহজাহান ও তাঁর ভাইরা ছাড়াও স্থানীয় ১০-১২ জন লোক ছিল। পরবর্তীতে মাইকে ‘দুবাই শাহজাহানের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে’ বলে মাইকে ঘোষণা করা হলে স্থানীয় কয়েকশ’ মানুষ সেখানে জড়ো হন এবং তাদের পিটুনিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান মিলন।

ঘটনার সময় সন্তানকে স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী এক নারী। নিরাপত্তার খাতিরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী বলেন, ‘তিনজনরেই প্রথমে অনেক মাইর দেয়। সুযোগে দুইজন পলাইয়া গেলেও মিলন আটকা পড়ে। মাইকে ডাকাত ঢুকছে এনাউন্স হইলে আরও সবাই জড়ো হয়। পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রও শুরুতে শাহজাহান ও তাঁর পরিবারের লোকজনের মারধরের’ বিষয়টি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে এই বিষয়ে মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই ঘটনায় মামলা নিয়েছি। ঘটনার সাথে পুরোনো কোন দ্বন্দ্ব প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কেউ সন্ত্রাসী হলেও তাকে বেআইনিভাবে মারধর করে হত্যার কোন সুযোগ নেই।

ঘটনার সময় মিলনের সাথে ছিলেন জোনায়েত হোসেন জনি (৩৪)। ঘটনাস্থলের অদূরে তাঁর বাড়ি। মঙ্গলবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাকে গুরুতর জখম অবস্থায় পাওয়া যায়।

জনি বলেন, তাকে কুপিয়ে জখম করেছে শাহজাহান ও তার ভাইরা। তিনি কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে দৌড়ে পালাতে সক্ষম হয়েছেন। ‘আমি পালিয়ে যাওয়ারও অন্তত ২০ মিনিট পর এলাকায় ডাকাত পড়েছে বলে মাইকে ঘোষণা করা হয়। এরপর মিলনের সাথে কী হইছে আমি জানি না’, বলেন তিনি।

মিলনের পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মিলনের সাথে এক সময় সখ্যতা ছিল শাহজাহানের। স্থানীয় মনোয়ার জুট মিলের যন্ত্রপাতি চুরি করে তা বিক্রির ভাগও মিলন দিতো শাহজাহানকে। বছরখানেক আগে শাহজাহানের বাড়ির নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনায় মিলনের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়।

যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেন শাহজাহানের পরিবারের লোকজন। মঙ্গলবার শাহজাহানের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী আবিদা খাতুন বলেন, তাদের বাড়িতে চুরির ঘটনায় মিলনের প্রতি ক্ষুব্দ ছিল স্থানীয় অধিকাংশ বাসিন্দাই। তাদের ভাষ্যমতে, এলাকায় প্রায় সময়ই চুরির ঘটনা ঘটে। মিলন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠতো। ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতো না। এ নিয়ে মিলন ও তাঁর বাহিনীর লোকজনের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ছিলেন স্থানীয়রা।

মিলন ও তাঁর সহযোগীদের হাতে ঘটনার দিন ধারালো অস্ত্র ছিল বলে স্থানীয়রা দাবি করলেও পুলিশের জব্দতালিকায় এমন কিছু ছিল না।
ঘটনাস্থলে যাওয়া সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেসুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মিলনকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের জখম ও হাত-পা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে ঘটনাস্থলে কোন অস্ত্র পাওয়া যায়নি।

মিলন হত্যার আগের রাতে উজ্জ্বল আহমেদ (২৬) ও মো. হৃদয় (২৩) নামে তাঁর দুই সহযোগীকে ধরে পিটিয়ে জখম করে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয়রা। পরে তাদের দু’জনকে পুরোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ।
হত্যার বিচার চান স্বজনরা

ময়নাতদন্ত ও আইনানুগ কার্যক্রম শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় স্থানীয় একটি কবরস্থানে দাফন করা হয় মিলনের মরদেহ। কবরস্থানে নারীদের প্রবেশ নিষেধ তাই বাইরের সড়কের উপর বসেছিলেন মিলনের বৃদ্ধা মা সহিতুন নেছা। পাশে শাশুড়ি খোদেজা বেগমের কোলে মিলনের এক বছর বয়সী কন্যা সন্তান মরিয়ম। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিলনের স্ত্রী রহিমা বেগম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন অদূরে ভ্যানগাড়িতে প্যাকেটবন্ধি স্বামীর লাশের দিকে। সহিতুন নেছার তিন ছেলের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন মিলন। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে ছুটে এসেছেন তিনি। ছেলের কথা তুলতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন এই বৃদ্ধা।

তিনি বলেন, আমার পোলাডায় খারাপ আছিল মানলাম। কিন্তু তারে তো ধইরা পুলিশে দিতো পারতো। জেলে পঁইচা মরতো। দুই মাস পর হইলেও জেলে গিয়া তো চেহারাডা দেখতে পারতাম। তারে এমনে কেন মারলো? কিচ্ছু রাহে নাই গো বাজানডার শরীলো। মিলনের মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার রাতেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। ওই মামলার বাদী হন সহিতুন নেছা। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মিলনকে যেখানে হত্যা করা হয় সেখান থেকে কয়েক কদম দূরে মিলনের বড়ভাই মো. শরীফের বাড়ি। পেশায় ড্রেজার শ্রমিক শরীফ ঘটনার সময় ছিলেন কর্মস্থলে। তিনি বলেন, আমি নিজে ওই এলাকায় থাকি। আমরা খোঁজখবর নিয়া জানছি, পুরোনো ঝগড়ার জেরে আমার ভাইডারে পিটাইয়া, কোপাইয়া মারছে শাহজাহান ও তাঁর ভাইরা। তাগো লগেই প্রথমে ঝগড়াটা হইছে, তারপর এলাকাবাসীও নাকি মারছে। আমরা এতো কইলাম কিন্তু পুলিশ আসামির তালিকায় কারও নাম দিলো না। পুলিশ কয়, আপনারা তো কাউকে দেখেন নাই মারতে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘বাদীপক্ষের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে হত্যা মামলা হয়েছে থানায়। এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ মামলাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে।

তবে, পুলিশ স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন অভিযোগ করে মিলনের শ্বশুর নজিবুল হক বলেন, ‘একজন লোক সন্ত্রাসী, চোর, ডাকাত সবই তো মানলাম। কিন্তু তারে তো খুন করা হইছে। কারা খুন করলো সেইটা তো বাইর করা পুলিশের কাজ কিন্তু পুলিশ তো তিনদিনেও কাউকে চিহ্নিত করতে পারলো না। আমরা থানা পুলিশের কাছে নাম বললেও তারা লিখলো না। থানায় সুষ্ঠু তদন্ত না পাইলে আমরা কোর্টে যামু। এই খুনের বিচার আমরা চাই।

add-content

আরও খবর

পঠিত